তৃণমূলের উজ্জীবন ও রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন

 

আজকের কলামের প্রেক্ষাপট
আজকে দু’টি বিষয়ে লিখব। প্রথম বিষয়টি হলো, একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য তৃণমূল মানুষের ভালোবাসার ঘটনার একটি উদাহরণস্বরূপ হাটহাজারীর একটি ঘটনার বর্ণনা। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, পরিবর্তনের বাহন হিসেবে কোনটি অধিকতর বাস্তবসম্মত যথা : বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামো নাকি পরিবর্তিত রাজনৈতিক কাঠামো? এই দু’টি বিষয় নিয়ে লেখার প্রেক্ষাপট আছে। প্রথম বিষয়টির প্রেক্ষাপট নি¤œরূপ। সম্ভাব্য নির্বাচনের সময়সূচি হলো এই বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ অথবা আগামী বছরের জানুয়ারির প্রথমাংশে। ২০১১ সালে সংশোধিত বাংলাদেশের সংবিধানের ধারা মোতাবেকই নির্বাচন করার জন্য বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। অপরপক্ষে সরকারের বাইরের রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি বড় অংশ তথা বিএনপি ও ড. কামাল হোসেন ও প্রফেসর বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন রাজনীতির অঙ্গনের অংশ, সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক মহলের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে, ভিন্নতর কাঠামোতেই নির্বাচন চান। সমঝোতার মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত হবে সেটিকে এখন বাস্তবায়ন করতে গেলে, বর্তমান সংসদ কর্তৃকই আইন পাস করতে হবে।

অথবা সবার সম্মতিতে এমন একটা ব্যবস্থা বের করতে হবে যেন ভবিষ্যতে প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করা যায় অর্থাৎ পোস্ট ফ্যাক্টো বা ঘটনা-উত্তর সংবিধান সংশোধন। নির্বাচন সময়মতো অনুষ্ঠিত হবে মনে করেই, সব রাজনৈতিক দল তাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে; বিশেষত নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো। অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সব থেকে বেশি সুপরিচিত প্রখ্যাত ও সুসংগঠিত দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। নিবন্ধিত হোক বা অনিবন্ধিত হোক, নির্বাচনে আগ্রহী দলগুলো এখন তাদের প্রার্থী বেছে নেয়ার কাজ ইতোমধ্যে বহুলাংশে সেরে ফেলেছে; অনেক দলের ক্ষেত্রেই শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে, দলগুলো যেসব আঙ্গিক বা বৈশিষ্ট্য গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে বলে শুনেছি, জেনেছি, পর্যবেক্ষণ করেছি এবং অভ্যাস করেছি, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আঙ্গিক নি¤œরূপ: এক. প্রার্থীর সাথে তৃণমূল মানুষের সম্পর্ক কী রকম? দুই. প্রার্থীর সাথে রাজনৈতিক কর্মীদের সম্পর্ক কী রকম? তিন. প্রার্থীর আর্থিক অবস্থা কী রকম? চার. প্রার্থীর গণসংযোগে দক্ষতা কী রকম? পাঁচ. নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীর সাংগঠনিক কাঠামো কী রকম? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বিস্তারিতভাবে না দিয়ে, একটি ঘটনার উদাহরণ বর্ণনার মাধ্যমেই তুলে ধরছি।

চট্টগ্রামের মেজবান (সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম)
চট্টগ্রামের একটি আসন হলো চট্টগ্রাম-৫ (সম্পূর্ণ হাটহাজারী উপজেলা এবং উপজেলাসংলগ্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১ নম্বর ও ২ নম্বর ওয়ার্ড)। হাটহাজারী উপজেলার প্রথম নির্বাচিত (১৯৮৫) উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম। অতঃপর তিনি পরপর চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। যথা ফেব্রুয়ারি ১৯৯১, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬, জুন ১৯৯৬ এবং অক্টোবর ২০০১ সাল। ২৮ মে ২০১৮ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। এর আগে তিনি কম-বেশি দুই বছরকাল অসুস্থ ছিলেন। ইন্তেকালের পর, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামাজিক রেওয়াজ অনুযায়ী এলাকাবাসীর সম্মানে মেজবান বা মেজ্জান দেয়া হয়। মরহুম সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মৃত্যুর পর সময়টা ঘোর বর্ষা ছিল বিধায়, মেজ্জান দেয়ার সময়টা একটু বিলম্বিত করা হয়েছিল। পাঠক এই কলাম পড়ছেন আজ বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮। আজ থেকে পাঁচ দিন আগে শুক্রবার ১৪ সেপ্টেম্বর সেই রেওয়াজ মোতাবেক কাক্সিক্ষত বা প্রতিশ্রুত মেজবান (চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় মেজ্জান) অনুষ্ঠিত হয়।

মরহুমের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না; দু’জন কন্যাসন্তান মাত্র; বড়জন হচ্ছেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেত্রী ও চট্টগ্রাম উত্তর বিএনপির সদস্য, প্রখ্যাত তরুণ ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা। মেজ্জানের স্বাগতিক বা হোস্ট ছিলেন মরহুমের পরিবার তথা স্ত্রী ও দুই কন্যা, মরহুম ওয়াহিদুল আলমের বর্তমানে জীবিত তিন কনিষ্ঠ ভাই প্রমুখ। ১৪ সেপ্টেম্বর শুধু মেজ্জান ছিল না। মেজ্জানে ২৫ হাজার মেহমানের খাবারের বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। মেজ্জানে উপস্থিতি কত ছিল সেটা বলা মুশকিল তবে অভিজ্ঞ মেজবানে উপস্থিত পর্যবেক্ষক চট্টগ্রামবাসীর মতে, ২০-২৫ হাজার মানুষ দুপুরে মেজবান খাবার খেয়েছে। চট্টগ্রাম হতে হাটহাজারীগামী জাতীয় সড়কের পাশেই, আমান বাজার ও লালিয়ারহাট এলাকায় অবস্থিত তিনটি বিশাল আকারের কমিউনিটি সেন্টারে পুরুষগণের জন্য এবং ২০০ মিটার দূরে নিজ বাড়ির বিশাল উঠোনে প্যান্ডেলের নিচে মহিলাদের জন্য বন্দোবস্ত ছিল। সে এক বিশাল যজ্ঞ ছিল এবং মহান আল্লাহর দয়ায় সফল ছিল।

সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের শোকসভা
১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা থেকে নিয়ে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মেজ্জানের খাওয়া-দাওয়া চললেও সে দিন অরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান ছিল। বেলা ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সময়ে মরহুম সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের স্মরণে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। আয়োজক বা স্বাগতিক ছিলেন উপজেলা বিএনপি এবং মঞ্চে অন্যতম সঞ্চালক ছিলেন উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব সোলায়মান মঞ্জু। অন্য তিনজন সঞ্চালক ছিলেন হাটহাজারী থানা যুবদলের সাবেক সভাপতি সৈয়দ ইকবাল, চট্টগ্রাম মহানগর বায়েজিত থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তরুণ নেতা মো: হারুণ এবং বিএনপি নেতা সৈয়দ মোস্তফা আলম মাসুম। প্যান্ডেলের নিচে হাজারের অধিক মানুষ বসার জন্য চেয়ার ছিল; বৃষ্টি ও রোদ থেকে বাঁচার জন্য ওপরে সুন্দর আচ্ছাদন ছিল। শোকসভার মঞ্চে কম-বেশি পঞ্চাশজন বসার বন্দোবস্ত ছিল। শুক্রবার জুমার নামাজের সময় সন্নিকট হওয়ায় শোকসভায় বক্তব্যগুলো সংক্ষিপ্ত হলেও ছিমছাম ছিল এবং রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক ছিল।

সম্মানিত মেহমানগণের কয়েকজন
সেই শোকসভায় এবং মেজ্জানে হাটহাজারী উপজেলার জাতীয়তাবাদী ঘরানার কর্মীরা বিশেষত সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের অনুসারী বা ভক্ত বা ভালোবাসার মানুষেরা খোলাভাবে উপস্থিত হন। রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে, যথা আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, হাটহাজারীর বিভিন্ন ইউনিয়নের নির্বাচিত নেতারা বা সাধারণভাবে সম্মানিত নেতাকর্মীরা উপস্থিত হয়েছিলেন। দীর্ঘ দিন পর জাতীয়তাবাদী ঘরানার মানুষ তথা রাজনৈতিক কর্মীরা মিলিত হওয়ার একটি সুযোগ পেয়েছিলেন। সেই মেজ্জানে এবং শোকসভায় ঢাকা থেকেও বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মেহমান যান। শোকসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা থেকে যাওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলাম খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা থেকে যাওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য চট্টগ্রামের সন্তান, সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ঢাকা থেকে যাওয়া অন্য মেহমানদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির অন্যতম ভাইস চেয়ারম্যান বেগম সেলিমা রহমান, বরকতউল্লাহ বুলু, জয়নাল আবেদীন ফারুক, মোহাম্মদ শাহজাহান, প্রচার সম্পাদক শহিদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, মহিলা দল নেত্রী সুলতানা আহম্মেদ, বেগম নূরে আরা সাফা, সৈয়দা আশরাফী পাপিয়া প্রমুখ।

মঞ্চে উপস্থিত চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাজনৈতিক মেহমানদের মধ্যে ছিলেন চট্টগ্রাম বিএনপি মহানগর সভাপতি ডাক্তার শাহাদত, মহানগর বিএনপি সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আবু সুফিয়ান, মহানগর সেক্রেটারি আবুল হাশেম বক্কর, উপজেলা চেয়ারম্যান মাহবুবুল আলম চৌধুরী, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মনোয়ারা বেগম, গোলাম আকবর খন্দকার, আহমদ খলিল, আবদুল হালিম, সাবেক মন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, সাথী উদয় কুসুম বড়ুয়া, জাতীয় পার্টির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুব শামীম, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এস এম ফজলুল হক, মহানগর মহিলা দল সভাপতি ও সেক্রেটারি প্রমুখ। শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন নাজিম উদ্দিন যিনি এককালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ তথা চাকসুর নির্বাচিত সহসভাপতি ছিলেন এবং ওই সুবাদে এখনো তিনি মানুষের কাছে ভিপি নাজিম হিসেবে পরিচিত ও আদরের। জ্যেষ্ঠ সুপরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যে অনিবার্য কারণে বিলম্বে হলেও উপস্থিত হয়েছিলেন (সস্ত্রীক) হাটহাজারীর সন্তান ও বর্তমান মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ।

কেন নামগুলো উল্লেখ করলাম
এতগুলো নাম নেয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে, ঢাকা মহানগরের কেন্দ্রীয় বিএনপি এবং চট্টগ্রামের বিএনপি নেতাদের উপস্থিতির তাৎপর্য উল্লেখ করা। উপজেলা লেভেলে কর্মীরা অত্যন্ত উৎসাহিত হয়েছেন, উৎফুল্ল হয়েছেন। উপজেলা লেভেলে কর্মীরা এতগুলো জ্যেষ্ঠ নেতাকে একত্রে মঞ্চে দেখে অনুভব করেছেন তাদের মরহুম নেতা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমকে ঢাকার নেতারা কত গভীরভাবে ভালোবাসতেন। ঢাকা থেকে জ্যেষ্ঠ নেতারা গিয়ে তৃণমূলদের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা উজ্জ্বলভাবে পালন করেছেন। তার জন্য তাদের প্রতি ধন্যবাদ। শুধু বিএনপি নয়, সব রাজনৈতিক দলের জন্যই এটি একটি অনুকরণীয় ঘটনা। একটি কলামে এর থেকে বেশি নাম উল্লেখ করা মুশকিল। কিন্তু মঞ্চের নিচেও শ্রোতামণ্ডলীর মধ্যে আরো অনেক উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক নেতা উপস্থিত ছিলেন যাদের নাম আমি হয়তো নিতে পারলাম না।

জেনারেল ইবরাহিম এবং ব্যারিস্টার শাকিলা
শোকসভার মঞ্চে সভাপতির পাশে অবশ্যই বসেছিলেন মরহুমের কন্যা এবং শোকসভা আয়োজনের পেছনে চালিকাশক্তি, মরহুমের জ্যেষ্ঠ সন্তান ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা। তিনি আমার মামাতো বোন। তার পিতা ছিলেন আমার মামা; আমার একমাত্র চাচির ভাই ছিলেন সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম। জনাব ওয়াহিদুল আলম বয়সে আমার থেকে সাড়ে তিন বছর বড়; কিন্তু তিনি আমার পিতার স্নেহধন্য এবং আস্থাভাজন ছিলেন। আমি ওই শোকসভায় উপস্থিত ছিলাম, মঞ্চে আসন গ্রহণ করেছিলাম এবং যথাসময়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রেখেছিলাম। আমি উপস্থিত ছিলাম মরহুমের ভাগিনা হিসেবে, শোকসন্তপ্ত পরিবারের আত্মীয় হিসেবে এবং ঘটনাক্রমে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে। ঘটনাক্রমে বললাম এ জন্য যে, ২০ দলীয় জোটের একটি শরিক দলের প্রধান হিসেবে দাওয়াত পেয়ে আমি ঢাকা থেকে যাইনি, আমি ঢাকা থেকে গিয়েছি আত্মীয় হিসেবেই কিন্তু আমি যে কল্যাণ পার্টির একজন কর্মী, এ কথাটাও অমোচনীয়। হাটহাজারীর একজন হিসেবে, ২০ দলীয় জোটের মধ্যকার একটি শরিক দলের প্রধান হিসেবে, মরহুমের ভাগিনা হিসেবে অবশ্যই আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাব; উপস্থাপক, সঞ্চালক ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি ধন্যবাদ জানাব।

অবশ্যই ধন্যবাদ জানাব ঢাকা থেকে যাওয়া সম্মানিত প্রধান অতিথি এবং অন্যান্য অতিথিকে। যারা অতিথি ছিলেন তারা বক্তব্যও রেখেছেন; সবাই মরহুম ওয়াহিদুল আলমের রাজনৈতিক জীবনের ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন। জনাব ওয়াহিদুল আলমের মৃত্যু হয়েছিল ২৮ মে। তার মাত্র কয়েক দিন পর ৬ জুন ২০১৮ নয়া দিগন্ত পত্রিকার অষ্টম পৃষ্ঠায় আমার লেখা কলামের শিরোনাম ছিল ‘তৃণমূল রাজনীতিতে দলীয় আনুগত্য ও মানুষের ভালোবাসা’; সেখানে একটি কলামের সীমিত পরিসরে ওয়াহিদুল আলমের রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়ন করেছি।

হাটহাজারীতে আমার রাজনৈতিক উপস্থিতি
২০১১ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে আমাদের সঙ্গে বিএনপি নেতৃত্বের মতবিনিময় ও দাওয়াত বিনিময় হয়েছিল। তখন চারদলীয় জোটকে সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ চলছিল। আমাদের দাওয়াত দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ইতিবাচক উত্তর দিয়েছিল। রো প্রক্রিয়া শেষ হতে চার-পাঁচ মাস লেগেছিল; ১৮ এপ্রিল ২০১২ ১৮ দলীয় জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। যা হোক, দেশনেত্রী বেগম জিয়ার সাথে আলাপের প্রসঙ্গে যাই। জোটে যোগদানের জন্য চূড়ান্ত মতবিনিময় হয়েছিল দেশনেত্রীর সাথে, ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার। সে সময় বিভিন্ন আলাপের পর্যায়ে দেশনেত্রী সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমকে বলেছিলেন, আমি যেন আমার জন্মস্থান হাটহাজারীতেই রাজনৈতিক সময় দিই। সেই থেকে আমি হাটহাজারীতে সময় দিচ্ছি। সময় দিতে গিয়ে বিভিন্ন ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে, বিভিন্ন হাট-বাজারে, বিভিন্ন স্কুল-মাদরাসায়, ওয়াজ মাহফিলে বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছি, সফর করেছি। মামা সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম বেঁচে থাকতেও এবং মৃত্যুর পরেও মানুষের মুখে মুখে তার প্রশংসা শুনেছি; কিভাবে তিনি সাধারণ মানুষকে আপন করে নিতেন সেই বর্ণনা শুনেছি; তার নিরহঙ্কার জীবনযাপনের কথা শুনেছি।

নবীন রাজনৈতিক কর্মী সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, প্রবীণ অভিজ্ঞ পরীক্ষিত রাজনৈতিক নেতা তারই মামা ওয়াহিদুল আলমের প্রশংসা শুনে মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়েই যাচ্ছেন গত সাত বছর ধরে। ৬ জুন ২০১৮ কলামের বক্তব্যগুলোর পুনরাবৃত্তি আজ করছি না। সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম অনেক ধনী ছিলেন না; কোনো প্রকার আর্থিক দুর্নীতির ধারে-কাছে যাননি; কিন্তু মানুষের খেদমত করেছেন, মানুষের আপদ-বিপদে দাঁড়িয়েছেন। তার ভাগিনা সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম এই শিক্ষাটিকে অতি গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছে। সম্ভাব্য সব রাজনৈতিক দলের ৩০০ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের জন্যও, অথবা ৩০০ থেকে কম যত আসনই হোক, সেসব আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের জন্যও এই শিক্ষা অতি গুরুত্বপূর্ণ।

এই কলামের দ্বিতীয় আলোচ্য বিষয়
আজকের দ্বিতীয় বিষয়টি হলো পরিবর্তনের কাঠামো। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির নীতিবাক্য হলো পরিবর্তনের জন্য রাজনীতি। ইংরেজি পরিভাষায় পলিটিক্স ফর চেঞ্জ। অর্থাৎ আমরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন চাই। কিন্তু চাইলেই তো হবে না, চাওয়াটাকে বাস্তবায়ন করতে হলে উপযুক্ত জায়গা থেকে চাইতে হবে, উপযুক্ত মঞ্চ থেকে চাইতে হবে। অনেক কণ্ঠে চাইতে হবে, লাখো কণ্ঠে চাইতে হবে। ১১ বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বারাক ওবামা স্লোগান তুলেছিলেন আমেরিকায় চেঞ্জ উই নিড, চেঞ্জ ইউ ক্যান। অর্থাৎ আমাদের পরিবর্তন প্রয়োজন, আমরা পরিবর্তন আনতে পারব। ৪ ডিসেম্বর ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির সব নেতাকর্মী এবং তার চেয়ারম্যান এই স্লোগান দিয়ে আসছে, এই স্লোগান তুলে আসছে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন।

কিন্তু কল্যাণ পার্টির সীমিত সাধ্যে, বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পদ্ধতি এমনই যে, কোটি কোটি মানুষ ভোট দেবেন, নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক প্রার্থীকে। অনেক প্রার্থীর মধ্য থেকে একজন জয়ী হবেন এবং পার্লামেন্টে যাবেন। প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত ৩০০ জন পার্লামেন্ট সদস্যের মধ্যে মেজরিটি সংখ্যক যেই মত অবলম্বন করবেন বা যেই মত প্রকাশ করবেন, সেই মতটা গৃহীত হবে, সেই মোতাবেকই বাংলাদেশ চলবে। অতএব ওই পার্লামেন্ট সদস্যরা যদি বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন না চান, তাহলে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা প্রায় অসম্ভব। প্রায় অসম্ভব বললাম এ জন্য, গণজাগরণ বা গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে যদি বাংলাদেশের পার্লামেন্টকে বাধ্য করা যায়, তাহলেও ওই পরিবর্তন আনা সম্ভব। কিন্তু আমরা স্বাভাবিক নিয়মে চিন্তা করব, স্বাভাবিক পরিবেশ ও পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করব, এ জন্য আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে রাজনীতির শিখর তথা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের শিখর, পার্লামেন্টকে নিয়ে।

ব্যারিস্টার পার্থ এবং জনাব মাহি
রোববার ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ রাতে এসএ টিভিতে তিনজন আলোচকের টকশো ছিল। তিনজনের মধ্যে দু’জন ছিলেন যথাক্রমে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল (এবং আদিতে চারদলীয় জোটের অংশীদার) মিডিয়া ব্যক্তিত্ব জনপ্রিয় টিভি আলোচক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ এবং অপরজন ছিলেন বিকল্পধারা বাংলাদেশ-এর জ্যেষ্ঠ নেতা সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব জনপ্রিয় টিভি আলোচক, সাবেক সংসদ সদস্য মাহি বি. চৌধুরী। তাদের সুদীর্ঘ জ্ঞানগর্ভ আলোচনার সারমর্ম এই কলামের সীমিত পরিসরে আনা মুশকিল। তবে একবাক্যে যদি বলতে হয় তাহলে সেটা এ রকম দাঁড়ায়। পার্থ বলেন, পরিবর্তন প্রয়োজন তবে সেটা বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমেই বা বিদ্যমান পদ্ধতিতে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েই সেই পরিবর্তন আনতে হবে। মাহি বলেন, বিদ্যমান পদ্ধতি বা বিদ্যমান কাঠামো পরিবর্তনের চেতনা ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে; তরুণ প্রজন্মের কোটি কোটি সদস্য প্রবীণদের চিন্তাচেতনার স্থবিরতায় আশান্বিত নয়; তাই ২০১৮ সালের শেষাংশে ব্যস্ত রাজনীতির পরিমণ্ডলে, পরিবর্তনকেই লক্ষ্যবস্তু করে রাজনৈতিক উদ্যোগ নেয়াটা প্রয়োজন। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে, অতীতেও বহু লিখেছি, ভবিষ্যতেও লিখব। তাই আজকের কলাম এখানেই শেষ।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *